ডাইনোসর সম্পর্কে ৮টি অবাক করা তথ্য যা আপনি হয়তো জানেন না
ছোটবেলায় ডাইনোসরের গল্প শুনে বা সিনেমা দেখে রোমাঞ্চিত হননি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। বিশাল আকৃতির এই প্রাণীগুলো কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। তাদের জীবাশ্ম আজও বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন নতুন রহস্য খুলে দিচ্ছে।
ডাইনোসর সম্পর্কে আমাদের ধারণার অনেকটাই সিনেমা থেকে আসা, আর তার মধ্যে বেশ কিছু ভুলও আছে। চলুন জেনে নিই ডাইনোসর সম্পর্কে ৮টি চমকপ্রদ তথ্য, যেগুলো আপনার ধারণা বদলে দিতে পারে।
১. ডাইনোসর পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে প্রায় ১৬ কোটি বছর
ডাইনোসররা প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়। বিজ্ঞানীদের হিসাবে তারা প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত টিকে ছিল। অর্থাৎ ডাইনোসরের রাজত্বকাল ছিল প্রায় ১৬ কোটি বছর। তুলনায় আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) পৃথিবীতে এসেছে মাত্র প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে। আমরা ডাইনোসরের তুলনায় নবাগত।
২. ডাইনোসর পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, পাখিরা তাদেরই বংশধর
এটি হয়তো সবচেয়ে অবাক করা তথ্য। বর্তমান বিজ্ঞানের মতে, আজকের পাখিরা ডাইনোসরেরই জীবিত বংশধর। বিশেষ করে থেরোপড (Theropod) গোষ্ঠীর ডাইনোসর থেকে পাখির বিবর্তন ঘটেছে। টি-রেক্সের মতো ভয়ংকর শিকারির সাথে আপনার বাড়ির উঠোনের চড়ুই বা মুরগির দূরসম্পর্কের আত্মীয়তা আছে, ভাবতেই অবাক লাগে। এ কারণেই অনেক বিজ্ঞানী বলেন, ডাইনোসর আজও আমাদের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।
৩. সব ডাইনোসর বিশাল আকৃতির ছিল না
ডাইনোসর বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে দৈত্যাকার প্রাণী। কিন্তু সব ডাইনোসর বড় ছিল না। কিছু ডাইনোসর ছিল মুরগি বা কবুতরের মতো ছোট। যেমন কমপসগনাথাস (Compsognathus) আকারে ছিল প্রায় একটি বড় মুরগির সমান। আবার অন্যদিকে সবচেয়ে বড় ডাইনোসররা, যেমন সরোপড গোষ্ঠীর আর্জেন্টিনোসরাস, ছিল বহু মিটার লম্বা এবং তাদের ওজন ছিল কয়েক দশ টন। ডাইনোসরের জগতে আকারের এই বৈচিত্র্য ছিল বিস্ময়কর।
৪. "ডাইনোসর" শব্দের অর্থ "ভয়ংকর গিরগিটি"
ডাইনোসর (Dinosaur) শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে, যার অর্থ "ভয়ংকর গিরগিটি" বা "ভয়ানক টিকটিকি"। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার রিচার্ড ওয়েন এই নামটি প্রস্তাব করেন। যদিও নামে "গিরগিটি" আছে, ডাইনোসররা আসলে আধুনিক টিকটিকি বা সরীসৃপ থেকে আলাদা একটি গোষ্ঠী।
৫. টি-রেক্সের কামড় ছিল অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী
টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত মাংসাশী ডাইনোসরদের একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, এর কামড়ের শক্তি ছিল স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এর দাঁত ছিল করাতের মতো ধারালো এবং হাড় গুঁড়ো করে ফেলার ক্ষমতা ছিল। তবে মজার বিষয়, এর সামনের হাত দুটি ছিল আকারে খুবই ছোট, যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল আজও শেষ হয়নি।
৬. অনেক ডাইনোসরের গায়ে ছিল পালক
আগে ভাবা হতো ডাইনোসররা সবাই সরীসৃপের মতো আঁশযুক্ত চামড়ার ছিল। কিন্তু চীনে পাওয়া একের পর এক জীবাশ্ম প্রমাণ করেছে যে অনেক ডাইনোসরের, বিশেষ করে থেরোপডদের, গায়ে ছিল পালক। এই পালক সব ক্ষেত্রে ওড়ার জন্য ছিল না। শরীর গরম রাখা, সঙ্গী আকর্ষণ করা বা প্রদর্শনের কাজেও এগুলো ব্যবহার হতো বলে ধারণা করা হয়। ফলে আধুনিক বিজ্ঞানীদের আঁকা ডাইনোসরের ছবি আগের চেয়ে অনেকটাই আলাদা।
৭. ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করত ডাইনোসর
ডাইনোসররা ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করত। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্ম ও বাসার নিদর্শন পাওয়া গেছে। কিছু জীবাশ্ম প্রমাণ করে, কোনো কোনো ডাইনোসর ডিমে তা দিত এবং বাচ্চাদের যত্নও নিত, অনেকটা আজকের পাখিদের মতো। ডাইনোসরের ডিমের আকার ও আকৃতি প্রজাতিভেদে আলাদা হতো।
৮. প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগের মহাবিপর্যয়ে বিলুপ্তি
ডাইনোসর বিলুপ্তির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হলো, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানে। ধারণা করা হয় মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপের কাছে চিক্সুলুব (Chicxulub) এলাকায় এই সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে ধুলা ও ছাইয়ে আকাশ ঢেকে যায়, সূর্যের আলো কমে যায়, আবহাওয়া বদলে যায় এবং খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞানীরা আরও মনে করেন, সে সময়ে আগ্নেয়গিরির প্রবল অগ্ন্যুৎপাতও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল। এই মহাবিপর্যয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ডাইনোসর সম্পর্কে আমরা কীভাবে জানি?
ডাইনোসর সম্পর্কে আমাদের সব জ্ঞানের উৎস হলো জীবাশ্ম (Fossil)। কোটি বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হাড়, দাঁত, ডিম এমনকি পায়ের ছাপ পাথরে পরিণত হয়ে সংরক্ষিত থাকে। প্যালিওন্টোলজিস্ট বা জীবাশ্মবিদরা এগুলো খুঁড়ে তুলে বিশ্লেষণ করেন এবং ডাইনোসরের চেহারা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন। প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রজাতির ডাইনোসর আবিষ্কৃত হচ্ছে, তাই এই বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ক্রমাগত বাড়ছে।
শেষ কথা
ডাইনোসর শুধু অতীতের কোনো দানব নয়, বরং পৃথিবীর ইতিহাস ও প্রাণের বিবর্তন বোঝার এক জানালা। পাখির সাথে তাদের সম্পর্ক, পালকের আবিষ্কার কিংবা বিলুপ্তির রহস্য, প্রতিটি তথ্যই মনে করিয়ে দেয় আমাদের এই গ্রহ কত বিচিত্র ও পরিবর্তনশীল। এই তথ্যগুলো আপনার ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং কমেন্টে জানান, কোন তথ্যটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে।

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog