ঘাড় ও কাঁধ ব্যথা কমানোর ৮টি কার্যকরী উপায়
সারাদিন অফিসে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, মোবাইলে ঝুঁকে থাকা কিংবা ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো, এসব কারণে আজকাল ঘাড় ও কাঁধের ব্যথা প্রায় ঘরে ঘরে দেখা যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘাড় শক্ত হয়ে আছে, কাঁধ ভারী লাগছে, মাথা ঘোরালেই টান লাগছে, এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। প্রথমে ব্যথাটা সামান্য মনে হলেও অবহেলা করলে এটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় রূপ নিতে পারে, এমনকি মাথাব্যথা ও হাতে ঝিনঝিনির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সুখবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘাড় ও কাঁধের ব্যথা কিছু সহজ অভ্যাস বদলালেই অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। আজকের পোস্টে আমরা জানব ঘাড় ও কাঁধ ব্যথার সাধারণ কারণ এবং ৮টি কার্যকরী উপায়, যেগুলো আপনি ঘরে বসেই অনুসরণ করতে পারবেন।
ঘাড় ও কাঁধ ব্যথা কেন হয়?
ব্যথা কমানোর উপায় জানার আগে কারণগুলো বুঝে নেওয়া জরুরি। সাধারণত যেসব কারণে এই ব্যথা হয়:
১. দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে কাজ করা
২. মোবাইল বা ল্যাপটপে অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে থাকা (একে বলা হয় "টেক নেক")
৩. অতিরিক্ত মানসিক চাপ, যার ফলে কাঁধের পেশি শক্ত হয়ে যায়
৪. ভুল বালিশ ব্যবহার বা ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো
৫. ব্যায়ামের অভাব ও পেশির দুর্বলতা
৬. ভারী ব্যাগ একদিকের কাঁধে বহন করা
৭. হঠাৎ ঝটকা লাগা বা পেশিতে টান পড়া
১. সঠিক ভঙ্গিতে বসুন
ঘাড় ও কাঁধ ব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ ভুল বসার ভঙ্গি। চেয়ারে বসার সময় পিঠ সোজা রাখুন, কাঁধ শিথিল রাখুন এবং পা মাটিতে সমতলভাবে রাখুন। সামনের দিকে ঝুঁকে বা কুঁজো হয়ে বসা এড়িয়ে চলুন। পিঠের নিচের অংশে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য ছোট একটি বালিশ বা কুশন ব্যবহার করতে পারেন। কিছুদিন সচেতনভাবে চেষ্টা করলে সঠিক ভঙ্গি অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
২. স্ক্রিন চোখের সমান্তরালে রাখুন
কম্পিউটারের মনিটর এমনভাবে রাখুন যেন স্ক্রিনের উপরের অংশ আপনার চোখের সমান্তরালে থাকে। ল্যাপটপ ব্যবহার করলে নিচে বই বা স্ট্যান্ড দিয়ে উঁচু করে নিন। মোবাইল ব্যবহারের সময়ও ফোনটি চোখের কাছাকাছি তুলে ধরুন, মাথা নিচু করে নয়। মাথা যত সামনে ঝুঁকে থাকে, ঘাড়ের ওপর চাপ তত বেড়ে যায়। এই ছোট পরিবর্তনটিই অনেকের ব্যথা অর্ধেকে নামিয়ে আনে।
৩. প্রতি ৩০ মিনিটে বিরতি নিন
একটানা অনেকক্ষণ এক ভঙ্গিতে বসে থাকলে পেশি আড়ষ্ট হয়ে যায়। তাই প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর অন্তত ১-২ মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়ান, একটু হাঁটুন, হাত-পা ছড়িয়ে নিন। ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখলে ভুলে যাওয়ার সমস্যা থাকে না। এই ছোট বিরতিগুলো রক্তসঞ্চালন ঠিক রাখে এবং পেশিকে ক্লান্তি থেকে বাঁচায়।
৪. নিয়মিত হালকা স্ট্রেচিং করুন
কিছু সহজ স্ট্রেচিং ঘাড় ও কাঁধের ব্যথায় দারুণ কাজ করে:
• ঘাড় ডানে-বামে ঘোরানো: ধীরে ধীরে মাথা ডানদিকে ঘুরিয়ে ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর বামদিকে করুন।
• কান কাঁধে ছোঁয়ানোর চেষ্টা: ডান কান ডান কাঁধের দিকে নামান, ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর উল্টোদিকে।
• কাঁধ ঘোরানো: দুই কাঁধ একসঙ্গে ধীরে ধীরে সামনে থেকে পেছনের দিকে ১০ বার ঘোরান।
• দুই হাত পিঠের পেছনে জড়ো করে বুক সামনে এগিয়ে দিন।
মনে রাখবেন, স্ট্রেচিং করার সময় কখনো জোর খাটাবেন না বা ঝটকা দেবেন না। ধীরে ও আরামের সীমার মধ্যে করুন।
৫. গরম সেঁক ও প্রয়োজনে ঠান্ডা সেঁক দিন
পেশি শক্ত হয়ে ব্যথা হলে গরম সেঁক খুব উপকারী। একটি গরম পানির ব্যাগ বা গরম তোয়ালে ১৫-২০ মিনিট ঘাড় ও কাঁধে রাখুন। এতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং পেশি শিথিল হয়। আর হঠাৎ আঘাত লেগে ফুলে গেলে প্রথম ১-২ দিন ঠান্ডা সেঁক (বরফ কাপড়ে মুড়ে) দেওয়া ভালো। সরাসরি ত্বকে বরফ বা অতিরিক্ত গরম কিছু লাগাবেন না।
৬. সঠিক বালিশ ও ঘুমানোর ভঙ্গি বেছে নিন
অনেকে সকালে ঘাড় ব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে ওঠেন। এর কারণ হতে পারে খুব উঁচু বা খুব শক্ত বালিশ। বালিশ এমন হওয়া উচিত যা ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁকের সঙ্গে মানিয়ে যায় এবং মাথাকে খুব উঁচু বা খুব নিচু করে না। চিত বা কাত হয়ে ঘুমানো ঘাড়ের জন্য ভালো। উপুড় হয়ে ঘুমালে ঘাড় এক পাশে ঘোরানো থাকে, যা ব্যথার বড় কারণ। তাই এই অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
৭. মানসিক চাপ কমান
স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তায় আমাদের কাঁধের পেশি অজান্তেই টান টান হয়ে থাকে। অনেকে খেয়ালই করেন না যে তাঁরা কাঁধ উঁচু করে রেখেছেন। তাই দিনে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিন, চোখ বন্ধ করে কয়েক মিনিট শান্ত থাকুন। নিয়মিত হাঁটা, প্রার্থনা বা পছন্দের কাজে সময় দিলে মন যেমন শান্ত হয়, তেমনি কাঁধের পেশিও শিথিল হয়।
৮. ব্যথা বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন
ঘরোয়া উপায়ে কয়েকদিনেও ব্যথা না কমলে অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান:
• হাত বা আঙুলে অবশ ভাব বা ঝিনঝিনি
• ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকা
• জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
• আঘাত বা দুর্ঘটনার পর ব্যথা শুরু হওয়া
• বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের সঙ্গে কাঁধে ব্যথা
নিজে নিজে কড়া ব্যথার ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস করা ঠিক নয়। সঠিক কারণ জেনে চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।
ব্যথা প্রতিরোধে আরও কিছু ছোট টিপস
• ভারী ব্যাগ দুই কাঁধে সমানভাবে বহন করুন, অথবা ওজন কমিয়ে নিন।
• প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন।
• পর্যাপ্ত পানি পান করুন, কারণ পানিশূন্যতায় পেশি আরও শক্ত হয়ে যায়।
• ফোনে কথা বলার সময় কাঁধ ও কানের মাঝে ফোন চেপে ধরে রাখবেন না।
• নিয়মিত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
শেষ কথা
ঘাড় ও কাঁধ ব্যথা আধুনিক জীবনের একটি সাধারণ সমস্যা হলেও একে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া, হালকা স্ট্রেচিং ও স্ট্রেস কমানোর মতো সহজ অভ্যাসগুলো আজ থেকেই শুরু করুন। ছোট ছোট পরিবর্তনই আপনাকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যথামুক্ত রাখবে। আর ব্যথা বেশি হলে বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
এই পোস্টটি আপনার উপকারে এলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাঁরা অফিসে বা পড়ার টেবিলে সারাদিন বসে থাকেন। আপনার কোন উপায়টি সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে, তা কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।
(এখানে প্রতিটি পোস্টের মতো সাধারণ সতর্কতা: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।)

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog