ডেঙ্গু প্রতিরোধের ৮টি কার্যকরী উপায়
বর্ষা ও বর্ষার পরের সময়টা বাংলাদেশে ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন, আর অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো সতর্ক না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। সুখবর হলো, কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে ডেঙ্গু অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই পোস্টে আমরা জানব ডেঙ্গু কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে বাঁচা যায়, কী কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে এবং কখন দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গু কীভাবে ছড়ায়?
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এডিস মশা এই ভাইরাস বহন করে এবং কামড়ের মাধ্যমে একজন মানুষ থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে ভোর ও বিকেলে বেশি কামড়ায়। এদের শরীরে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মশা পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো জমা পানি দূর করা।
১. ঘরের আশপাশে জমা পানি পরিষ্কার করুন
এডিস মশার বংশবিস্তারের প্রধান জায়গা হলো জমে থাকা পরিষ্কার পানি। ফুলের টব, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা, ভাঙা বালতি, প্লাস্টিকের কৌটা, এসির নিচের ট্রে, ফ্রিজের পেছনের ট্রে, ছাদের কার্নিশ কিংবা নির্মাণকাজের জায়গায় পানি জমতে পারে। অন্তত সপ্তাহে একবার এসব জায়গা ঘুরে দেখুন এবং পানি ফেলে দিন। কারণ এডিস মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। সপ্তাহে একবার পানি ফেলে দিলে এই চক্র ভেঙে যায়।
২. ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন
যদিও এডিস মশা দিনে কামড়ায়, তবুও শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি যারা দিনে ঘুমান, তাদের জন্য মশারি অত্যন্ত জরুরি। যদি পরিবারের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, তাহলে রাত-দিন সবসময় তাকে মশারির ভেতরে রাখুন। না হলে সেই মশা আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ে ভাইরাস নিয়ে অন্যদের কামড়াতে পারে।
৩. মশা তাড়ানোর ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করুন
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ত্বকের খোলা অংশে মশা তাড়ানোর ক্রিম বা লোশন লাগাতে পারেন। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির রিপেলেন্ট পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য ব্যবহারের আগে প্যাকেটের নির্দেশনা ভালো করে পড়ুন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঘরের ভেতরে মশা মারার স্প্রে ব্যবহার করলে ঘরের দরজা-জানালা কিছুক্ষণ বন্ধ রাখুন এবং খাবার ও শিশুদের জিনিসপত্র ঢেকে রাখুন।
৪. ফুল হাতা ও ঢিলেঢালা জামা পরুন
মশার কামড় থেকে বাঁচতে শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা ভালো। ফুল হাতার জামা, লম্বা প্যান্ট বা সালোয়ার এবং মোজা পরলে কামড়ের ঝুঁকি অনেক কমে। হালকা রঙের কাপড় বেছে নিন, কারণ গাঢ় রঙ মশাকে বেশি আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বাইরে বের হলে এই বিষয়টি মাথায় রাখুন।
৫. দরজা-জানালায় নেট লাগান
ঘরে মশা ঢোকা আটকাতে জানালা ও ভেন্টিলেটরে মশা প্রতিরোধী নেট বা জাল লাগানো খুব কার্যকর। নেট ছিঁড়ে গেলে বা ফুটো হলে সঙ্গে সঙ্গে মেরামত করুন। সন্ধ্যার সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখলেও ঘরে মশার প্রবেশ অনেকটা কমে যায়।
৬. ঘর ও চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন
ঘরের অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে কোণ, খাটের নিচ, পর্দার পেছন এবং আলমারির আড়ালে এডিস মশা বিশ্রাম নেয়। নিয়মিত এসব জায়গা পরিষ্কার করুন। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় কেটে ফেলুন, ময়লা ঠিকমতো ঢাকনাওয়ালা বিনে ফেলুন এবং নর্দমা যেন বন্ধ না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। মনে রাখবেন, শুধু নিজের ঘর পরিষ্কার রাখলেই হবে না, প্রতিবেশীদেরও সচেতন করুন। কারণ মশা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে সহজেই উড়ে যায়।
৭. ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো চিনে রাখুন
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও গাঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শরীরে লালচে র্যাশ। জ্বর সাধারণত দুই থেকে সাত দিন থাকে। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে বসে থাকবেন না। দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান। মনে রাখবেন, ডেঙ্গুতে বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রচুর তরল খাবার খাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি ও ফলের রস পান করা যেতে পারে।
৮. বিপদচিহ্ন দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে যান
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির সময় হলো জ্বর কমে যাওয়ার পর। অনেকে ভাবেন জ্বর নেমে গেছে, তাই ভালো হয়ে গেছি। কিন্তু এ সময়েই রোগী জটিল অবস্থায় যেতে পারেন। নিচের বিপদচিহ্নগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যান:
পেটে তীব্র ব্যথা
বারবার বমি হওয়া বা কিছু খেতে না পারা
নাক, মাড়ি বা অন্য কোথাও থেকে রক্তপাত
কালো রঙের পায়খানা বা রক্তবমি
অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঝিমিয়ে পড়া
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
প্রস্রাব খুব কমে যাওয়া
ডেঙ্গু হলে কী করবেন না?
ডেঙ্গুর জ্বর বা ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা অন্য ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না। এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর কমানোর জন্য কোন ওষুধ কতটুকু খাবেন, সেটি অবশ্যই চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। এছাড়া কারও কথা শুনে বা সামাজিক মাধ্যমের গুজবে কান না দিয়ে শুধু বিশ্বস্ত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
সবচেয়ে সহজ সূত্র মনে রাখুন
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সূত্রটি খুব সহজ: জমা পানি ফেলুন, মশার কামড় এড়ান, লক্ষণ দেখলে সতর্ক হোন এবং বিপদচিহ্নে দেরি করবেন না। এই চারটি নিয়ম পরিবারের সবাই মেনে চললে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
শেষ কথা
ডেঙ্গু ভয়ের রোগ হলেও সচেতনতা ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে এর ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। আজই আপনার বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও আশপাশটা একবার ঘুরে দেখুন এবং কোথাও পানি জমে থাকলে ফেলে দিন। আপনার ছোট একটি উদ্যোগ আপনার পরিবার ও প্রতিবেশীদের সুরক্ষিত রাখতে পারে।
এই পোস্টটি উপকারী মনে হলে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে সবাই সচেতন হতে পারে। আপনার কোনো প্রশ্ন বা অভিজ্ঞতা থাকলে নিচে কমেন্টে জানান।
বিঃদ্রঃ: এই পোস্টের তথ্য সাধারণ সচেতনতার জন্য। কোনো শারীরিক সমস্যা হলে অবশ্যই registered চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog