মায়ের ত্যাগ ও ছেলের সাফল্য
(কাল্পনিক অনুপ্রেরণামূলক গল্প)
পদ্মা নদীর তীরে ছোট্ট একটি গ্রাম। সেই গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে টিনের চালার এক জীর্ণ ঘরে থাকত রহিমা বেগম আর তাঁর একমাত্র ছেলে আরিফ। আরিফের বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন তার বাবা হঠাৎ অসুখে মারা যান। সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে রহিমার কাঁধে।
স্বামী হারানোর শোক সামলানোর সময়টুকুও পাননি রহিমা। কারণ ঘরে তখন চালের হাঁড়ি প্রায় খালি। ছেলের স্কুলের বেতন, বই-খাতা, দুবেলার খাবার, সবকিছুর চিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। সেদিন রাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, "যত কষ্টই হোক, আমার ছেলেকে আমি মানুষের মতো মানুষ করবই।"
সেলাই মেশিনের শব্দে কাটত রাত
রহিমার একটি পুরোনো সেলাই মেশিন ছিল। বিয়ের সময় বাবার বাড়ি থেকে পেয়েছিলেন। সেই মেশিনই হয়ে উঠল তাঁর সংসার চালানোর একমাত্র ভরসা। দিনের বেলা তিনি গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করতেন, আর রাতে হারিকেনের আলোয় বসতেন সেলাই নিয়ে। পাড়ার মানুষের ব্লাউজ, পেটিকোট, বাচ্চাদের জামা সেলাই করে যা পেতেন, তা দিয়েই চলত সংসার।
আরিফ অনেক রাতে ঘুম ভেঙে দেখত, মা তখনও মেশিনের পাশে বসে আছেন। সেলাই মেশিনের টকটক শব্দ ছিল তার ঘুমপাড়ানি গান। সে মাঝে মাঝে বলত, "মা, তুমি ঘুমাও না কেন?"
রহিমা হেসে জবাব দিতেন, "তুই ঘুমিয়ে পড়, বাবা। মায়ের ঘুম আসে না।"
আসলে ঘুম আসত না, কারণ ঘুমালে সংসার চলত না। কিন্তু সেই কথা তিনি ছেলেকে কখনো বুঝতে দেননি।
অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা
আরিফ ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিল। কিন্তু অভাবের কারণে অনেক সময় তার স্কুলের বেতন দিতে দেরি হতো। শিক্ষকরা বিরক্ত হতেন, সহপাঠীরা হাসাহাসি করত। একবার তো পরীক্ষার আগের দিন বেতন বাকি থাকায় তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হলো।
বাড়ি ফিরে আরিফ মাকে কিছুই বলল না। কিন্তু রহিমা ঠিকই বুঝে ফেললেন। পরদিন ভোরে তিনি তাঁর গলার একমাত্র সোনার চেইনটি বিক্রি করে দিলেন। এটি ছিল তাঁর বিয়ের স্মৃতি। সেই টাকায় আরিফের বকেয়া বেতন শোধ হলো, আর ছেলে পরীক্ষায় বসতে পারল।
আরিফ পরে এই ঘটনা জানতে পেরে মায়ের হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল। মা শুধু বললেন, "সোনা আবার কেনা যায় রে বাবা, কিন্তু তোর পড়াশোনা একবার নষ্ট হলে আর ফেরানো যায় না।"
সেদিন আরিফ মনে মনে ঠিক করে নিল, সে মায়ের এই ত্যাগের মর্যাদা রাখবে।
কঠিন পথে এগিয়ে চলা
এসএসসিতে আরিফ ভালো ফলাফল করল। এরপর কলেজে ভর্তি হতে হলে শহরে যেতে হবে। শহরে থাকা-খাওয়ার খরচ জোগানো রহিমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তবু তিনি পিছপা হলেন না। নিজের খাওয়া কমিয়ে, রাতের ঘুম কমিয়ে, আরও বেশি সেলাইয়ের কাজ নিলেন।
আরিফও শহরে গিয়ে বসে থাকেনি। সকালে কলেজ, বিকেলে ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ানো, আর রাতে নিজের পড়া। দিনের পর দিন এভাবে চলল। অনেক রাত সে ক্লান্ত হয়ে ভেঙে পড়ত, মনে হতো সব ছেড়ে দিই। কিন্তু তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠত মায়ের সেই সেলাই মেশিনের পাশে বসা মুখটা। আর নতুন করে শক্তি ফিরে পেত।
মাঝে মাঝে মা ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন, "বাবা, ঠিকমতো খেয়েছিস তো?" আরিফ মিথ্যে বলে দিত, "হ্যাঁ মা, খুব ভালো আছি।" অথচ সেদিন হয়তো সে দুই বেলা না খেয়েই কাটিয়েছে। মা-ছেলে দুজনেই একে অপরকে সুখী দেখানোর অভিনয় করত।
অবশেষে সাফল্যের দিন
বছর গড়িয়ে গেল। আরিফ কঠোর পরিশ্রম করে দেশের একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেল এবং ভালো ফলাফল করে স্নাতক শেষ করল। এরপর একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেল।
যেদিন নিয়োগপত্র হাতে পেল, সেদিন সে আর দেরি করেনি। সোজা ছুটে গেল গ্রামের সেই টিনের ঘরে। দরজার সামনে গিয়ে দেখল, মা তখনও সেই পুরোনো মেশিনে সেলাই করছেন। চুলে পাক ধরেছে, চোখে মোটা চশমা, হাত দুটো কাজ করতে করতে শক্ত হয়ে গেছে।
আরিফ মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল। নিয়োগপত্রটি মায়ের হাতে দিয়ে বলল, "মা, তোমার ছেলে পেরেছে।"
রহিমা কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল পানি। এত বছরের কষ্ট, অপেক্ষা আর নির্ঘুম রাতের সব ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে ধুয়ে গেল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "আমি জানতাম, বাবা। আমি জানতাম।"
মায়ের জন্য ছেলের উপহার
চাকরির প্রথম বেতন পেয়ে আরিফ প্রথমেই একটি নতুন সেলাই মেশিন কিনে আনল। মাকে বলল, "মা, এখন থেকে তোমাকে আর কারও জন্য রাত জেগে সেলাই করতে হবে না। তুমি চাইলে নিজের শখে সেলাই করবে।"
এরপর সে মায়ের গলায় একটি নতুন সোনার চেইন পরিয়ে দিয়ে বলল, "আমার পড়ার টাকা জোগাতে যে চেইনটা বিক্রি করেছিলে, সেটার জায়গায় এটা।"
রহিমা হেসে ফেললেন, সেই হাসির সঙ্গে মিশে ছিল চোখের জল।
গল্প থেকে শিক্ষা
এই গল্প আমাদের অনেক কিছু শেখায়:
- মায়ের ত্যাগের কোনো তুলনা নেই। সন্তানের জন্য মা নিজের সুখ, ঘুম, এমনকি প্রিয় জিনিসটিও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না।
- অভাব কখনো স্বপ্নের পথে বাধা নয়। সদিচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিও জয় করা যায়।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেরি করা ঠিক নয়। বাবা-মা বেঁচে থাকতেই তাঁদের ভালোবাসা ও সম্মান দিন। কারণ তাঁরা আমাদের জন্য যা করেন, তা কোনো কিছুর বিনিময়েই শোধ করা যায় না।
- হাল না ছাড়াই আসল সাফল্য। আরিফ বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়িয়েছিল বলেই শেষ পর্যন্ত সফল হতে পেরেছে।
শেষ কথা
আমাদের আশপাশে এমন অসংখ্য রহিমা আছেন, যাঁরা নীরবে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে চলেছেন। আজই সময় করে আপনার মাকে একবার ফোন করুন, তাঁর খবর নিন, বলুন, "মা, তোমাকে ভালোবাসি।" এই ছোট্ট কথাটাই তাঁর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার।
(বি.দ্র.: গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে মিল থাকলে তা কাকতালীয়।)
গল্পটি ভালো লাগলে আপনার মা-বাবাকে ও প্রিয়জনদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং কমেন্টে জানান—আপনার জীবনে মায়ের কোন ত্যাগটি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
✨ নারীদের স্টাইলিশ ও আরামদায়ক ড্রেসের কালেকশন! ✨
সাশ্রয়ী দামে মনের মতো ড্রেস খুঁজছেন? আমাদের Facebook পেজে দেখে নিন নতুন সব ডিজাইন।
👉 পেজ ভিজিট করুন:

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog