আমরা প্রায় প্রতিদিনই পিঁপড়া দেখি। রান্নাঘরে, দেয়ালে, বাগানে বা মিষ্টির টুকরোর ওপর সারি বেঁধে চলা পিঁপড়ার দল আমাদের চোখে নতুন কিছু নয়। তাই এদের নিয়ে আমরা তেমন ভাবি না। কিন্তু বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, এই ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবন আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি জটিল ও বিস্ময়কর।
চলুন, পিঁপড়া সম্পর্কে এমন ৮টি তথ্য জেনে নিই, যা পড়ার পর আপনি আর কখনো এদের সাধারণ ভাবতে পারবেন না।
১. নিজের ওজনের বহুগুণ ভার বহন করতে পারে
পিঁপড়া তার নিজের শরীরের ওজনের ১০ থেকে ৫০ গুণ পর্যন্ত ভার বহন করতে পারে। প্রজাতিভেদে এই ক্ষমতা কিছুটা কমবেশি হয়। একটু ভাবুন, একজন মানুষ যদি এভাবে ভার বইতে পারত, তাহলে সে কয়েকটি গাড়ি একসঙ্গে মাথায় তুলে নিতে পারত! পিঁপড়ার শরীর ছোট হওয়ায় তার পেশির শক্তি ও শরীরের আয়তনের অনুপাত অনেক বেশি, আর এ কারণেই সে এত শক্তিশালী।
২. পৃথিবীতে এদের সংখ্যা কল্পনাতীত
বিজ্ঞানীদের অনুমান, পৃথিবীতে পিঁপড়ার সংখ্যা কয়েক কোটি কোটি। কোনো কোনো হিসাবে সব পিঁপড়ার মোট ওজন পৃথিবীর সব মানুষের মোট ওজনের কাছাকাছি, তবে এটি একটি অনুমানভিত্তিক হিসাব। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই পিঁপড়া পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ১২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির পিঁপড়া শনাক্ত করেছেন।
৩. ডাইনোসরের যুগ থেকে টিকে আছে
পিঁপড়া পৃথিবীতে এসেছে প্রায় ১০ কোটি বছরেরও বেশি আগে, অর্থাৎ ডাইনোসরের যুগে। ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেছে, বরফযুগ এসেছে-গেছে, কিন্তু পিঁপড়া ঠিকই টিকে আছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো এদের দলবদ্ধ জীবন ও দ্রুত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
৪. পিঁপড়ার আছে দুটি পাকস্থলী
অনেক পিঁপড়ার শরীরে দুটি আলাদা পাকস্থলী থাকে। একটিতে সে নিজের খাবার হজম করে। অন্যটিকে বলা হয় "সামাজিক পাকস্থলী", যেখানে সে খাবার জমিয়ে রাখে। ফিরে এসে সেই খাবার মুখে মুখে অন্য পিঁপড়াদের খাইয়ে দেয়, বিশেষ করে রানি ও বাচ্চাদের। পুরো কলোনির খাবার ভাগাভাগির এটি এক অদ্ভুত ব্যবস্থা।
৫. রানি পিঁপড়া বেঁচে থাকে বহু বছর
সাধারণ কর্মী পিঁপড়া কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর বাঁচে। কিন্তু রানি পিঁপড়ার আয়ু অনেক বেশি। কিছু প্রজাতির রানি ২০ বছরেরও বেশি বাঁচতে পারে, যা এত ছোট একটি পোকার জন্য অবিশ্বাস্য। রানির কাজ একটাই, ডিম পাড়া এবং কলোনিকে টিকিয়ে রাখা।
৬. পিঁপড়াও করে চাষাবাদ
পিঁপড়া শুধু খাবার সংগ্রহই করে না, কিছু প্রজাতি চাষাবাদও করে! দক্ষিণ আমেরিকার পাতা-কাটা পিঁপড়া গাছের পাতা কেটে এনে মাটির নিচের ঘরে জমায় এবং তার ওপর ছত্রাক জন্মায়। সেই ছত্রাকই তাদের প্রধান খাবার। আবার কিছু পিঁপড়া এফিড নামের ক্ষুদ্র পোকা পালন করে এবং তাদের শরীর থেকে নির্গত মিষ্টি রস খায়। মানুষ কৃষিকাজ শেখার বহু কোটি বছর আগেই পিঁপড়া এই কৌশল রপ্ত করেছে।
৭. পা গুনে পথ চেনে
সাহারা মরুভূমির একটি পিঁপড়া প্রজাতি নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এরা নাকি নিজেদের পদক্ষেপ গুনে দূরত্ব মাপে। খাবার খুঁজতে বহুদূর গিয়েও এরা সোজা পথে বাসায় ফিরে আসতে পারে। এর সঙ্গে ব্যবহার করে সূর্যের অবস্থান। শুধু তাই নয়, চলার পথে এরা এক ধরনের রাসায়নিক গন্ধ, যাকে বলে ফেরোমন, ছড়িয়ে যায়, যাতে অন্য পিঁপড়ারা সেই পথ ধরে চলতে পারে।
৮. নিজেদের শরীর দিয়ে সেতু ও ভেলা বানায়
এটি হয়তো সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য। কিছু প্রজাতির পিঁপড়া, যেমন আর্মি অ্যান্ট, একে অপরকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের শরীর দিয়ে জীবন্ত সেতু তৈরি করে, যাতে বাকিরা তার ওপর দিয়ে পার হতে পারে। আবার বন্যার সময় ফায়ার অ্যান্ট নামের পিঁপড়া একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পানির ওপর ভেলার মতো ভেসে থাকে। এমনভাবে তারা রানি ও ডিমকে বাঁচিয়ে রাখে।
পিঁপড়ার কাছ থেকে আমাদের শেখার বিষয়
পিঁপড়ার জীবনে আমরা অনেক শিক্ষা পেতে পারি:
- দলবদ্ধভাবে কাজ করলে অসম্ভবও সম্ভব হয়।
- ছোট হলেও কেউ দুর্বল নয়।
- পরিকল্পনা ও পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি।
- বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোই আসল শক্তি।
শেষ কথা
পিঁপড়া আকারে ছোট হলেও তার ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা ও সংগঠন দক্ষতা বিস্ময়কর। প্রকৃতির প্রতিটি ছোট প্রাণীর পেছনেই লুকিয়ে আছে অনেক অজানা গল্প। পরের বার পিঁপড়ার সারি দেখলে একটু থেমে ভাববেন, এই ক্ষুদ্র প্রাণীটি পৃথিবীতে আপনার চেয়ে কোটি কোটি বছর বেশি সময় ধরে টিকে আছে।
আপনার কাছে পিঁপড়া সম্পর্কে কোন তথ্যটি সবচেয়ে অবাক করা মনে হলো? কমেন্টে জানান। পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog