তামবোরা: মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক অগ্ন্যুৎপাতের গল্প
মানব ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণটি ঘটেছিল ১৮১৫ সালে, ইন্দোনেশিয়ার তামবোরা আগ্নেয়গিরিতে। প্রায় তিন মাস ধরে চলা এই অগ্ন্যুৎপাত পৃথিবীজুড়ে তৈরি করেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, মহামারি এবং জলবায়ু বিপর্যয়। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মারা যায় প্রায় ৯০ হাজার মানুষ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই দুর্যোগের প্রভাব এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পেছনেও আংশিকভাবে দায়ী ছিল তামবোরা–এর ছড়ানো জলবায়ুর অস্বাভাবিকতা।
বৈশ্বিক অন্ধকারের বছর
তামবোরার অগ্ন্যুৎপাতে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টন ছাই, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস, যা উঠে যায় বায়ুমণ্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তর পর্যন্ত। সেখানে গঠিত সালফেটের বিশাল এরোসল মেঘ পুরো পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সূর্যের আলো কমে যায়, দিনেও আকাশ ছিল ম্লান ও ধোঁয়াটে।
ফলে ১৮১৬ সালকে ইতিহাসে মনে করা হয় “The Year Without Summer” বা ‘গ্রীষ্মহীন বছর’।
-
বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা নেমে যায় প্রায় তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসে
-
জুন–জুলাই মাসেও ইউরোপ, আমেরিকা ও উত্তর গোলার্ধে দেখা দেয় তুষারপাত
-
একদিন তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠলেও পরদিনই নেমে আসে ভয়ংকর ঠান্ডা
-
কৃষি উৎপাদন ভেঙে পড়ে, খাদ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়
দুর্ভিক্ষ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, জার্মানির মানুষ ১৮১৭ সালকে ডাকত “ভিখারিদের বছর”। আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এর প্রভাব—অনেকে সজারু এবং সেদ্ধ বুনো পাতা খেয়ে বাঁচতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশে কলেরার মহামারির সূচনা
অস্বাভাবিক জলবায়ুর মধ্যে টিকে থাকতে কিছু ব্যাকটেরিয়া দ্রুত অভিযোজিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ভিব্রিও কলেরা, যেটি পরে পৃথিবীর অন্যতম বড় মহামারি সৃষ্টি করে।
১৮১৭ সালে এর প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় বাংলার যশোরে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতবর্ষ, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই মারা যায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ।
সুনামি, রোগব্যাধি এবং বৈশ্বিক বিপর্যয়
তামবোরা অগ্ন্যুৎপাতের বিস্ফোরণে ইন্দোনেশিয়ার আশপাশের দ্বীপগুলোতে সুনামি আঘাত হানে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। শিল্প, কৃষি, অর্থনীতি—সব কিছু বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
দুর্যোগের মাঝেও নতুন আবিষ্কার
তামবোরা শুধু ধ্বংসই আনেনি, অদ্ভুতভাবে কিছু নতুন ইতিহাসও তৈরি করেছে।
১) বাইসাইকেলের জন্ম
দুর্ভিক্ষে পশুখাদ্যের সংকটে বহু ঘোড়া মারা যায়। এক রাজকর্মচারীর প্রিয় ঘোড়াটি মারা গেলে তিনি কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে দুটি চাকা জুড়ে একটি বাহন তৈরি করেন—
যাতে ছিল না প্যাডেল, চেইন বা ব্রেক।
এই যন্ত্রটিই পরবর্তীতে আধুনিক বাইসাইকেলের পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত হয়।
২) ভ্যাম্পায়ার সাহিত্যের সূচনা
অস্বাভাবিক ঠান্ডা ও বৃষ্টি–ঝড়ের কারণে সুইজারল্যান্ডের লেক জেনেভার কাছে কয়েকজন কবি ও লেখক গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। তারা সময় কাটাতে আয়োজন করেন ভূতের গল্প লেখার প্রতিযোগিতা।
অংশগ্রহণকারীদের একজন ছিলেন লর্ড বায়রনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জন পলিডরি। তিনি ওই সময় লেখেন বিখ্যাত গল্প “দ্য ভ্যাম্পায়ার”, যা আধুনিক ভ্যাম্পায়ার জনরার প্রথম দিককার ভিত্তি তৈরি করে।
শেষ কথা
তামবোরা অগ্ন্যুৎপাত দেখিয়ে দিয়েছে, একটি আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণও কীভাবে পুরো মানবসভ্যতার জলবায়ু, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প–সাহিত্য এবং ইতিহাসকে প্রভাবিত করতে পারে। দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে পৃথিবী বিধ্বস্ত হলেও—এই বিপর্যয়ের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় বাইসাইকেলের ধারণা এবং ভ্যাম্পায়ার সাহিত্যের নতুন যুগ।

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog