hh

বাজাউ উপজাতি: পানির নিচে ১৩ মিনিট নিঃশ্বাস আটকে রাখা রহস্যময় মানুষ




মানুষ কতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে রাখতে পারে পানির নিচে? বেশিরভাগ মানুষের জন্য উত্তরটা হবে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার একটি উপজাতির মানুষ এই সীমা ছাড়িয়ে যান বহুগুণ টানা ১০ থেকে ১৩ মিনিট পর্যন্ত পানির নিচে থাকতে পারেন তারা, কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই। তাদের পরিচয় বাজাউ উপজাতি।


কারা এই বাজাউ উপজাতি?

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের সমুদ্র উপকূল ঘিরে বাস করেন এই যাযাবর জলচারী জনগোষ্ঠী। প্রচলিত অর্থে তাদের কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ভূখণ্ড নেই সমুদ্রেই তাদের ঘরবাড়ি। বজরা বা হাউজবোটে জীবন কাটে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এই কারণে অনেকে তাদের ডাকেন 'সমুদ্রের যাযাবর' বা 'সি জিপসি' নামে।


দিনে ৫-৮ ঘণ্টা সমুদ্রের তলদেশে

বাজাউদের জীবিকা মূলত মাছ শিকার আর সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরশীল। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে, কোনো আধুনিক ডাইভিং যন্ত্রপাতি ছাড়াই তারা প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা সমুদ্রের নিচে কাটান। ডুব দেন প্রায় ৭০ মিটার পর্যন্ত গভীরে যা একজন প্রশিক্ষিত স্কুবা ডাইভারের জন্যও চ্যালেঞ্জিং।


বিজ্ঞান যা বলছে: অস্বাভাবিক বড় প্লীহা

এই ব্যতিক্রমী সহনশীলতার রহস্য উদঘাটনে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজাউদের প্লীহা (স্প্লিন) সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বড়। প্লীহা মানবদেহে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তকণিকা সংরক্ষণ করে; জরুরি প্রয়োজনে এই কণিকা রক্তে ছেড়ে দিয়ে শরীরে অতিরিক্ত অক্সিজেন সরবরাহ করে। বড় আকারের প্লীহার কারণে বাজাউদের শরীর দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক মাত্রায় অক্সিজেন ধরে রাখতে সক্ষম হয় অনেকটা প্রাকৃতিক অক্সিজেন ট্যাংকের মতো।


PDE10A: একটি বিশেষ জিনের ভূমিকা


এই শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের পেছনে দায়ী একটি বিশেষ জিন PDE10A। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রকেন্দ্রিক জীবনযাপনের ফলে বাজাউদের শরীরে এই জিনে পরিবর্তন ঘটেছে, যা থাইরয়েড হরমোনের মাধ্যমে প্লীহার আকার নিয়ন্ত্রণ করে। এটি বিবর্তনের একটি চমৎকার উদাহরণ কীভাবে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে মানবদেহ নিজেই বদলে যায়, প্রজন্মান্তরে।


যাদের নেই নিজস্ব কোনো দেশ

বাজাউদের জীবনের আরেকটি করুণ দিক হলো তাদের রাষ্ট্রহীনতা। এই উপজাতির অনেক মানুষ সারাজীবনে কখনও মাটিতে পা রাখেননি। কারণ তাদের নিজস্ব কোনো স্বীকৃত দেশ বা নাগরিকত্ব নেই। ডাঙায় নামলেই স্থানীয় প্রশাসনের রোষানলে পড়তে হয় তাদের, অনেক সময় তাড়িয়েও দেওয়া হয়। ফলে সমুদ্রই তাদের একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র পরিচয়।


শেষ কথা

বাজাউ উপজাতির গল্প শুধু একটি বিস্ময়কর জৈবিক অভিযোজনের গল্প নয়, এটি মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়েরও এক জীবন্ত দলিল। প্রকৃতির সাথে হাজার বছরের সহাবস্থান কীভাবে মানবদেহকেই বদলে দিতে পারে বাজাউরা তার এক জীবন্ত প্রমাণ।


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

বিজ্ঞাপন ব্লকার সনাক্ত হয়েছে

আমাদের সাইট বিনামূল্যে কনটেন্ট দিতে বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভরশীল। অনুগ্রহ করে আপনার Ad Blocker বন্ধ করে পেজটি আবার লোড করুন।