পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কমে গেলে কী হবে?
আমরা প্রতিদিন হাঁটি, দৌড়াই, লাফ দিই, কিন্তু কখনো ভেবে দেখি না কোন অদৃশ্য শক্তি আমাদের মাটির সঙ্গে ধরে রেখেছে। এই শক্তির নাম মাধ্যাকর্ষণ বল বা অভিকর্ষ। পৃথিবীর এই টান আছে বলেই আমরা মহাশূন্যে ভেসে যাই না, সাগরের পানি সাগরে থাকে, আর বাতাস পৃথিবীকে ঘিরে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, যদি কোনোভাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কমে যায়, তাহলে কী ঘটবে? চলুন জেনে নিই।
(বিঃদ্রঃ: এটি একটি কাল্পনিক বৈজ্ঞানিক আলোচনা। বাস্তবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ এভাবে কমে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ভয়ের কিছু নেই।)
[এখানে ভিডিওর HTML কোডটি বসান]
১. আপনার ওজন কমে যাবে, কিন্তু ভর একই থাকবে
অনেকেই ওজন ও ভর এক মনে করেন, আসলে দুটো আলাদা। ভর হলো আপনার শরীরে থাকা পদার্থের পরিমাণ, যা সব জায়গায় একই থাকে। আর ওজন হলো সেই ভরের ওপর মাধ্যাকর্ষণের টান। মাধ্যাকর্ষণ কমে গেলে আপনার ওজন কমবে, কিন্তু ভর একই থাকবে। উদাহরণ হিসেবে, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ। তাই পৃথিবীতে যার ওজন ৬০ কেজি, চাঁদে তার ওজন হবে মাত্র ১০ কেজির মতো।
২. সবাই অনেক উঁচুতে লাফাতে পারবে
মাধ্যাকর্ষণ কম মানে নিচের দিকে টান কম। তখন সামান্য লাফেই আপনি অনেক উঁচুতে উঠে যাবেন এবং নামতেও সময় লাগবে বেশি। চাঁদে নভোচারীরা যেভাবে ধীরে ধীরে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছিলেন, তখন পৃথিবীতেও ঠিক তেমন দৃশ্য দেখা যেত। ভারী জিনিস তোলা সহজ হতো, কিন্তু হাঁটাচলায় ভারসাম্য রাখা হতো বেশ কঠিন।
৩. বায়ুমণ্ডল ধীরে ধীরে মহাশূন্যে হারিয়ে যেত
পৃথিবীর বাতাস বা বায়ুমণ্ডলকে আটকে রেখেছে এই মাধ্যাকর্ষণই। টান কমে গেলে বাতাসের গ্যাস অণুগুলো সহজে মহাশূন্যে বেরিয়ে যেতে পারত। বাতাস পাতলা হয়ে যেত এবং বাতাসের চাপও কমে যেত। এর ফলে শ্বাস নেওয়া কঠিন হতো, আবহাওয়া বদলে যেত এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ত। মঙ্গল গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় ৩৮ শতাংশ, আর সেখানে বাতাস খুবই পাতলা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মঙ্গল তার বেশিরভাগ বায়ুমণ্ডল হারিয়েছে অতীতে।
৪. সাগর-মহাসাগর ও বৃষ্টির ধরন বদলে যেত
পানিও মাধ্যাকর্ষণের কারণে সাগরে টিকে আছে। বাতাসের চাপ কমে গেলে পানি সহজে বাষ্পীভূত হতো, ফলে জলীয়বাষ্প ও মেঘের আচরণ বদলে যেত। বৃষ্টির ফোঁটা ধীরে নামত, আর বন্যা, নদী ও ঝর্ণার প্রবাহও আগের মতো থাকত না। জোয়ার-ভাটার নিয়মেও বড় পরিবর্তন আসত।
৫. মানবদেহ দুর্বল হয়ে পড়ত
আমাদের হাড় ও পেশি প্রতিদিন মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করে শক্ত থাকে। মাধ্যাকর্ষণ কমলে এই কাজের চাপ কমে যেত, ফলে হাড়ের ঘনত্ব ও পেশির শক্তি কমে যেত। মহাকাশে যাওয়া নভোচারীদের ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে তাঁদের হাড় প্রতি মাসে প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয় হতে পারে। এছাড়া শরীরের রক্ত ও তরল পদার্থ উপরের দিকে জমে মুখ ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যাও হয়, আর মেরুদণ্ড কিছুটা লম্বা হয়ে উচ্চতা সামান্য বাড়তে পারে।
৬. গাছপালা ও প্রাণীদের গড়ন বদলে যেত
এখন বড় প্রাণী ও লম্বা গাছের ভার বহন করতে হয় শক্ত হাড় ও কাণ্ড দিয়ে। মাধ্যাকর্ষণ কম থাকলে অনেক উঁচু গাছ ও আরও বিশালদেহী প্রাণী টিকে থাকতে পারত। আবার বহু প্রাণীর শরীরের ভেতরের তরল চলাচল ও চলাফেরার ব্যবস্থা নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে সংকটে পড়ত। গাছের শিকড় মাটিতে আঁকড়ে থাকাও কঠিন হয়ে যেত।
৭. চাঁদ পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে দূরে সরে যেত
চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবীর টানের কারণেই। এই টান দুর্বল হলে চাঁদকে ধরে রাখা কঠিন হতো। ধীরে ধীরে সে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যেত। চাঁদ ছাড়া পৃথিবীর রাতের আকাশ, জোয়ার-ভাটা এবং এমনকি পৃথিবীর হেলে থাকা অক্ষের স্থিতিশীলতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
৮. মাধ্যাকর্ষণ প্রায় শূন্য হলে সবকিছু ভেসে যেত
পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘুরছে, বিষুবরেখায় এই ঘূর্ণন গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬৭০ কিলোমিটার। এখন মাধ্যাকর্ষণ যদি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ০.৩ শতাংশে নেমে যায়, তাহলে বিষুবরেখার কাছাকাছি মাটির ওপরের সবকিছু ঘূর্ণনের টানে ছিটকে মহাশূন্যে চলে যেতে শুরু করত। আর মাধ্যাকর্ষণ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে পৃথিবী আর নিজের আকার ধরে রাখতে পারত না, কারণ এই গ্রহকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে তার নিজের টানই।
শেষ কথা
মাধ্যাকর্ষণ আমাদের কাছে এত সাধারণ যে আমরা এর গুরুত্ব বুঝতেই পারি না। অথচ এই অদৃশ্য শক্তিই পৃথিবীকে জীবনের উপযোগী করে রেখেছে। বাতাস, পানি, আমাদের শরীর, চাঁদের কক্ষপথ, সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল। তাই পরের বার যখন মাটিতে পা ফেলবেন, একটু ভেবে দেখবেন, এই অদৃশ্য টানের জন্যই আপনি দাঁড়িয়ে আছেন।
আপনার কী মনে হয়, মাধ্যাকর্ষণ কমে গেলে সবচেয়ে মজার বা ভয়ের জিনিস কোনটি হতো? কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন এবং ব্লগের নতুন পোস্টের জন্য সঙ্গে থাকুন।

Thanks to comment Jibon Somossa official blog. Stay with us for more content. Follow us to Facebook. www.facebook.com/jibonsomossa.blog